কচুরিপানা ফুলের সাথে সখ্যতা যেদিন হলো

কচুরিপানা ফুলের সাথে সখ্যতা যেদিন হলো,
সেদিনের আমি কেবল অআকখ জ্ঞান আয়ত্ত করে পরীক্ষায় কোনোভাবে কী বুঝে না বুঝে লিখে এসে, ক্লাসে মাত্রই নিজেকে একজন আঁতেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছি।
ক্লাস নার্সারি-ওয়ানের অঢেল সিলেবাসের বোঝাও আমাকে আটকাতে পারেনি, ছুটিতে মামাবাড়িতে দুদণ্ড শান্তির খোঁজ করে আসতে।
রাজদূত ৭ (বর্তমান রাজদূত প্রাইম) লঞ্চে ঢাকা থেকে ইন্দুরহাট (দক্ষিণ কৌরিখারা) লঞ্চঘাটে পৌঁছাতে বারো ঘণ্টার বেশি সময় লাগলেও, এখন তা এক পলকের স্মৃতিমাত্র। তখন লঞ্চগুলো ইন্দুরহাটে সন্ধ্যা নদীর পাশে একটি সংযোগ খালে প্রবেশ করত।
লঞ্চ থেকে নেমেই, কিছু দূরে মিয়ারহাট। যেখান থেকে কিছু Sunken Deck ট্রলার আশেপাশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে, যেমন: মিয়ারহাট - গাওখালী, মিয়ারহাট - বৈঠাকাটা, ইত্যাদি। ওখান থেকেই কোনো একটা ট্রলারে উঠে, দেড় ঘণ্টা পর গোবর্ধন বাজারে নেমে, আরো এক-দুই ক্রোশ মামাবাড়ির পথে ছোটা।
অতঃপর, যা হয়, মামাবাড়ির আবদার। প্রতিবারের মতো, মামাবাড়িতে আমার একটাই ধ্রুব আবদার, শহর থেকে দূরে, নিঃস্বার্থ প্রকৃতির সংসর্গে কিছু ভালো সময়কে তুলোধুনো করে, পার করে দেওয়া।
কুকুরকে অহেতুক তাড়া করবার দাম্ভিকতা ছোটবেলায় বিশাল কিছু মনে হয়েছিল। ভাবতাম, গরুই বোধহয় সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী। গরুর কথায় কথায় কথা বললেও, যেহেতু কোনো বিদ্রূপাত্মক উত্তর বা প্রতিক্রিয়া পেতাম না।
তখন জোনাকিরা ছিল রাতে, প্রিয়তমা ছিল সাথে, রূপকথার নায়িকার ছদ্মবেশে। কতটা রোমান্টিকতা প্রতিটি শিশুর জীবনে!
সামনের অগভীর খালে কিছুক্ষণ পর পর, পেট্রোল পোড়াতে পোড়াতে ট্রলারের সশব্দ অভিযাত্রা, আর পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো করে, বৈঠার আঘাতে ধেয়ে চলা ডিঙিনৌকাগুলো দেখতে দেখতে, বেলা যে ফুরায়ে যায়। মৃত শামুকের খোলসের আঘাতে কত না জলজ বাস্তুসংস্থানে বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছি, আর নিজের সাথেই নিজে লড়েছি এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায়, কোন ঢিল কত দূরে পৌঁছোবে।
কাদা ছোড়াছুড়ি, ঢিল ছোড়াছুড়ির মেয়াদ ছুটি পর্যন্তই ছিল। আবারো, শহুরে প্রহসনে জীবনকে হাসির খোরাক বানাতে ফিরতেই হবে। বাস্তবে, এটাই আমার বেশি পছন্দের।
মতিভাই, আমার মায়ের মামা, তিনি তাঁর ডিঙিতে আমাদেরকে লঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দেবার স্নেহবৎসল দায়িত্ব বুঝে নেন। সহযাত্রী ছিল, মা, আর বাবা।
বীরদর্পে মতিভাইয়ের অভিজ্ঞ বৈঠানাড়ন,
আর আমার নৌকোর পাশ ছুঁই ছুঁই পানিতে হাতড়ায়ে, কিছু অমূল্য অনুভূতি কুড়োনোর চেষ্টা।
কচুরিপানার সাথে নৌকোর বিদ্রোহ চলতে চলতে, এক কচুরিপানা ফুল আমি প্রতিপক্ষ থেকে অনধিকার আত্মসাৎ করে নেই।
নির্জীব ফুলের সাথে দীর্ঘ নিঃশব্দ আলাপচারিতা শেষে, তখনও কেউ আমাকে পাগল বলেনি, হয়তো এটাই শৈশবের মাহাত্ম্য।

মতিভাই কোন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল, স্পষ্ট মনে নেই, হয়তোবা লঞ্চ পর্যন্তই। তা মনে না-ই থাক। তবে, স্পষ্ট মনে আছে যে, অগ্রদূত প্লাস নামের লঞ্চটি আমার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় ছিল।
আমার জন্য, অথবা আমার শৈশবকে আঁকড়ে ধরতে।
না জানি, আমি কতদিন আমার শৈশবকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *